খেলা
Trending

বিদ্রোহী লিগে মেসি-রোনালদো-নেইমারদের দেখার সম্ভাবনা বাড়ছে

দর্শক–সমর্থকের হিসেবে ইউরোপের শীর্ষ সব দল মিলে ভিন্ন এক প্রতিযোগিতায় নাম লেখাবে। সে লিগে প্রতিনিয়ত দেখা যাবে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, জুভেন্টাস, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, পিএসজিকে। চ্যাম্পিয়নস লিগ যা করতে পারে না, সেটাই করে দেখাবে এই লিগ। একই মৌসুমে ইউরোপের সব বড় দলকে অন্তত একবার মুখোমুখি করাবে।

এমন এক লিগের স্বপ্ন দেখছেন ফুটবলের বড় ক্লাবগুলোর হর্তাকর্তারা। একে আপাতত ডাকা হচ্ছে ‘ইউরোপিয়ান সুপার লিগ’ নামে। এত দিন শোনা গিয়েছিল, এই লিগ খেলার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে ১৬টি ক্লাব। আর এমন এক টুর্নামেন্টে ব্যস্ত থাকা মানেই তো চ্যাম্পিয়নস লিগের বিদায়। ঘরোয়া লিগ ও এই লিগে খেলার পর সূচিতে আর কিছু রাখা কঠিন বৈকি।

মেসি-রোনালদো-নেইমারদের

এত দিন এ নিয়ে অনেক ফিসফাস শোনা গেছে। এবার এই লিগের কিছুটা হলেও ভেতরের খবর বের করে এনেছে লা পারিসিয়েন। ফ্রেঞ্চ পত্রিকাটি যে দাবি করেছে, সে অনুযায়ী শীর্ষ সব কটি দল এই টুর্নামেন্ট খেলতে উন্মুখ হয়ে আছে। যে পরিমাণ অর্থের হাতছানি এই টুর্নামেন্টে, তাতে ফিফার হুমকি উপেক্ষা করে হলেও মাঠে নামতে পারে ক্লাবগুলো। আর সে সুবাদে চ্যাম্পিয়নস লিগ নয়, এই বিদ্রোহী লিগেই দেখা যাবে লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও নেইমারদের।

স্বত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বে জন্ম নিয়েছিল ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট সিরিজের। সে সময়কার সেরা সব খেলোয়াড়কে ডেকে এনে রঙিন পোশাকে নামিয়ে দেওয়া সেই টুর্নামেন্ট ক্রিকেটকেই বদলে দিয়েছিল। আইসিসির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বড় বড় তারকারা খেলেছিলেন বলেই এতটা প্রভাব ফেলতে পেরেছিল ক্যারি প্যাকারের ব্যক্তিত্বের লড়াই থেকে জন্ম নেওয়া সিরিজটা।

এমন টিভি স্বত্বের দ্বন্দ্ব জন্ম দিয়েছিল আইসিএলেরও। ভারতের ম্যাচ দেখানোর নিলামে বারবার বেশি অর্থের প্রস্তাব দিয়েও প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল জি স্পোর্টসকে। এর জবাবে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ বা আইসিএল নামে একটি টি-টোয়েন্টি লিগ চালু করেছিল তারা। সে টুর্নামেন্টে যোগ দিয়ে অনেক ক্রিকেটারই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশেরই আফতাব আহমেদের মতো ক্রিকেটার ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। আইসিএল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে বাধ্য করেছিল ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে নতুন করে ভাবতে, খেলোয়াড়দের সুযোগ–সুবিধা বাড়াতে।

মেসি-রোনালদো-নেইমারদের

ক্রিকেটের দুই বিদ্রোহী লিগ খেলায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু ফুটবলের বিদ্রোহী লিগ থেকে এমন কিছু আশা করাটা ভুল হবে। লা পারিসিয়েন জানিয়েছে, ১৬টি দল নয়, ২০টি দল নিয়ে হবে সুপার লিগ। এর মধ্যে স্থায়ী দলের সংখ্যা ১৫। অর্থাৎ এই ১৫ দল সব সময় এই লিগে থাকবে। বাকি পাঁচ দলকে আমন্ত্রণ জানানো হবে প্রতি মৌসুমে।

ফিফা হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে, যেসব ক্লাব এই বিকল্প টুর্নামেন্টে খেলবে, সেই ক্লাবগুলো ও তাদের খেলোয়াড়দের ফিফা ও এর মহাদেশীয় অঙ্গসংগঠনগুলো আয়োজিত কোনো টুর্নামেন্টে খেলতে দেওয়া হবে না। নিষিদ্ধ হবে সেই ক্লাবগুলো, নিষিদ্ধ হবেন সেই খেলোয়াড়েরা। অর্থাৎ ইউরো, কোপা আমেরিকা, এশিয়া কাপ, আফ্রিকান নেশনস কাপ এবং বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে এসব খেলোয়াড়কে আর দেখা যাবে না!

মেসি-রোনালদো-নেইমারদের

কোন ১৫ দল এ টুর্নামেন্ট খেলতে চায় সেটা দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে, কেন উয়েফা ও ফিফা এত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ব্যাপারটিকে, কেন তারা আগেভাগেই নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে রাখছে। ১৫ দলের মধ্যে স্পেনের রয়েছে তিনটি—বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ ও আতলেতিকো মাদ্রিদ। ইতালি থেকেও জায়গা করে নিয়েছে তিনটি—জুভেন্টাস, এসি মিলান ও ইন্টার মিলান। জার্মানি থেকে দুই প্রভাবশালী দল বায়ার্ন মিউনিখ ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থাকবে এখানে। আর ফ্রেঞ্চ লিগ থেকে আসবে পিএসজি।

ইংল্যান্ড থেকে আসবে ছয়টি দল! ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, আর্সেনাল, চেলসি ও টটেনহাম। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের বড় ছয় দলই এখানে থাকবে। এমন ১৫টি দল যদি চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে সরে আসে, তখন চ্যাম্পিয়নস লিগ নিয়ে মাতামাতি হবে কেন?

রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ ও জুভেন্টাস সভাপতি আন্দ্রেয়া আগনেল্লি এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী এবং যে অর্থের প্রস্তাব তাঁরা দিচ্ছেন, তাতে আপত্তি থাকার কথা নয় কোনো দলেরই। লা পারিসিয়েনে বলা হয়েছে, ‘প্রতি মৌসুমে পাঁচ ক্লাবকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। ২০ দলের এই লিগের শেষে প্লে-অফ থাকবে। শীর্ষ ছয় দল মৌসুমে ৩৫ কোটি ইউরো পাবে। এটা অনেক বড় এক অঙ্ক, বর্তমান চ্যাম্পিয়নস লিগ বিজয়ীই আট কোটি ইউরোর কাছাকাছি আয়ের আশা করতে পারে।’

মেসি-রোনালদো-নেইমারদের

চ্যাম্পিয়নস লিগ বিজয়ী হলেই যে আট কোটি ইউরো পায় একটি দল, সেটাও নিশ্চিত নয়। কারণ, চ্যাম্পিয়নস লিগ ইউরোপের প্রতিটি অঞ্চলের উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে প্রাইজ মানি দেয়। এ টুর্নামেন্ট থেকে প্রাপ্ত আয় অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন রিয়াল পেয়েছিল আট কোটি ইউরো। ওদিকে রানার্সআপ হওয়া জুভেন্টাস পেয়েছিল ১১ কোটি। কারণ, চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে স্পেনের বেশি দল থাকায় প্রাইজ মানি ভাগ হয়ে গিয়েছিল। ওদিকে ইতালির পক্ষ থেকে শুধু জুভেন্টাস থাকায় তারা অর্থের ভাগ বেশি পেয়েছিল। আর চ্যাম্পিয়নস লিগের আয় থেকে ছোট লিগগুলো ও দলগুলো অনুদান পায়। এটা ফুটবলের জন্য ভালো, কিন্তু বড় ক্লাবগুলো কেন সেটা মানবে? হাজার হলেও টিভি স্বত্বের বড় অংশ তো তাদের সুবাদেই আসে। তাই নিজেদের আয় নিজেদের কাছে রাখার এক টুর্নামেন্টে সায় দিচ্ছেন সবাই।

পেরেজ ও আগনেল্লির ধারণা, শীর্ষ ১৫ দলের এই টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়নস লিগের চেয়েও বেশি আয় করতে পারবে। পারিসিয়েনের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘এই ১৫ দলের গ্রুপ ৪০০ কোটি ইউরো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে। যদিও এই অর্থ কোত্থেকে আসবে, সেটা নিশ্চিত নয়। উয়েফা তাদের তিনটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ৩২৫ কোটি ইউরো আয় করে।’

এই সুপার লিগের ধারণা ২০১২ সালেই সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সবকিছু গুছিয়ে আনা হচ্ছিল না। করোনাকালে সব বড় ক্লাব আর্থিকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। আর এ কারণেই এই সুপার লিগ আয়োজনে মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা, ‘মূল উদ্দেশ্য হলো, খেলার সাফল্য-ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে উঠে নিরাপদ আয় নিশ্চিত করা। জুভেন্টাস সভাপতি আগনেল্লির মতে, এই স্বাস্থ্যসংকট ইউরোপের ক্লাবগুলোর আয় ৬৫০ থেকে ৮৫০ কোটি ইউরো কমিয়ে দিতে পারে।’

মেসি-রোনালদো-নেইমারদের

ইউরোপে করোনার ধাক্কা সামলে নেওয়ার সবচেয়ে ভালো ক্ষমতা আছে পিএসজির। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বলে, অর্থ নিয়ে কখনোই ভাবতে হয়নি তাদের। বারবার ইউরোপের অন্য দলগুলো তাদের আয় নিয়ে প্রশ্ন তুললেও উয়েফা কোনো সন্দেহজনক কিছু খুঁজে পায়নি। কিন্তু শীর্ষ ১৫ দলের অংশ হওয়ার এমন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার কারণ খুঁজে পাচ্ছে না পিএসজি। ফ্রেঞ্চ পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘পিএসজি সরাসরি এ প্রকল্পে নিজেদের নাম বলতে চাইছে না। নাসের আল খেলাইফি এলজি কাউন্সিল ও উয়েফার নির্বাহী কমিটির সদস্য। তাঁর পক্ষে এমন প্রকল্প নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলা কঠিন। কিন্তু পিএসজি কখনো এই প্রকল্পে তাদের নাম আসার বিষয়ে প্রতিবাদ জানায়নি। কারণ, এটা তাদের পক্ষেই কাজ করছে।’

পারিসিয়েনের দাবি, এভাবে সুপার লিগে নাম থাকার মানে হলো ইউরোপের কুলীন ক্লাবগুলোও মেনে নিচ্ছে, পিএসজি সেরাদের একটি। এখনো ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের স্বাদ না পেলেও তারা যে এখন দর্শক চাহিদার দিক থেকে প্রভাবশালী, এটা অন্যরা বুঝতে পারছে বলে খুশি দলটি, ‘এ তালিকায় নাম থাকার অর্থ, যেসব ক্লাবকে গোনায় ধরা হয়, নামে ভারী এবং মতামতের গুরুত্ব আছে, তাদের মধ্যে পিএসজিও আছে। পিএসজির অনেকেরই ধারণা, লিগ আঁ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয় এবং লিগটা খুব অপরিকল্পিতভাবে সামলানো হয়। ফ্রেঞ্চ লিগ ছেড়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও খুব একটা বাজে নজরে দেখা হবে না!’

পিএসজির মতো আর্থিকভাবে শক্তিশালী ক্লাবই যখন সুপার লিগ খেলতে আগ্রহী, সেখানে আর্থিক দুর্দশায় পড়া রিয়াল, বার্সেলোনা বা জুভেন্টাস যে খেলতে চাইবে; এটাই স্বাভাবিক!

Source
prothomalo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button